কাদের গণি চৌধুরী : আজ ১৭ নভেম্বর মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর মৃত্যু বার্ষিকী। তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থে একজন কিংবদন্তী নেতা। সাধারন মানুষের কাছে যিনি পরিচিত ছিলেন মজলুম জননেতা হিসাবে। তার সারাজীবন পর্যালোচনা করলে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে তার সম্পর্কে বলা 'এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার নির্যাতিত মানুষের নেতা মওলানা ভাসানী ’ কথাটির সত্যতা ফুটে উঠে। অন্যায় আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে তার ছিল আপসহীন সংগ্রাম। এই সংগ্রাম ছিল সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে। ছিল পাকিস্তানের স্বেরচারী শাসকদের বিরুদ্ধে। তেমনি ভাবে ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাৎকালীন সরকারের যাবতীয় কালা কানুন, গনতন্ত্রবিরোধী কার্যকলাপ ও জুলুমের বিরুদ্ধে তার কণ্ঠ ছিল সোচ্চার। এই বিল্পবী মহাপুরুষ কখনো আপোষ করেননি ক্ষমতা আর অর্থের সাথে এবং ক্ষমা করেননি কোন স্বৈরশাসককে। ভাসানী জীবনের সমস্ত সময়ই ব্যয় করেছেন গনমানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে। ১৯৪৭ সালের বিভাগ-পূর্ব সময়ে আসামে লাইনপ্রথা-বাঙাল খেদাওবিরোধী আন্দোলন থেকে ১৯৭৬ সালের ফারাক্কা অভিমুখে লংমার্চ আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহন বা নেতৃত্ব দেয়া তার জীবন, সংগ্রামের এক মহাকাব্য।
সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশবাদ ও আধিপত্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের প্রবাদ পুরুষ মওলানা ভাসানী ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে উপ-মহাদেশের নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষের পক্ষে তিনি আপোষহীন নেতৃত্ব দিয়েছেন।
’৫০ এর দশকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম সুর ধ্বণিত হয়েছিল তাঁর কন্ঠে। তিনি দেশবাসীকে প্রথম স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। দেশমাতৃকার মুক্তির পথ প্রদর্শক ছিলেন তিনি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং কৃষক শ্রমিক মেহনতি জনতার ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী ছিলেন প্রদীপ্ত এক আলোকবর্তিকা।
তাঁর অবস্থান ছিলো শোষনের বিরুদ্ধে শোষিতের পক্ষে।
অধিকার আদায়ে তিনি এদেশের মানুষকে সাহস যুগিয়েছেন তাঁর নির্ভিক ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের দ্বারা। তাঁর হুংকারে কেঁপে উঠত অত্যাচারী শাসক ও শোষক গোষ্ঠীর মসনদ।
জাতীয় ভয়াবহ দুর্দিনে তিনি জনগণেরপাশে থাকতেন আস্থাবান অভিভাবক হিসেবে।অসহায় মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়, গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় মওলানা ভাসানী আমাদের প্রেরনার উৎস।
তাঁর নিখাদ দেশপ্রেম, দেশ ও জাতির স্বার্থ রক্ষা এবং গণতন্ত্র ও মানবতার শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে যুগ যুগ ধরে আমাদেরকে অনুপ্রানিত করবে। তাঁর আদর্শকে সঠিকভাবে অনুসরণ করতে পারলেই আমরা আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হবো।
এদেশে আবারও গণবিরোধী শক্তি গায়ের জোরে, দিনের ভোট আগের রাতে সম্পন্ন করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে নিয়ে গণতন্ত্রে স্বীকৃত নাগরিকের সকল স্বাধীনতাকে হরণ করে নিয়েছে। জনগণের মতামতকে অগ্রাহ্য করে একের পর এক গোপন চুক্তির মাধ্যমে বর্তমানে দেশকে যেদিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে তাতে জাতীয় স্বাধীনতা বিপন্ন হয়ে পড়ছে। হত্যা, গুম, খুন, শোষণ -নিপীড়ন, সীমাহীন লুটপাটের পাশাপাশি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র কেড়ে নেয়ায় বাংলাদেশ এখন মনুষ্য বসবাসে অযোগ্য হয়ে পড়েছে। কেড়ে নেয়া হয়েছে মানুষের ভোটাধিকার। দুর্নীতি ও লুটপাট চলছে সমানতালে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নামে বাক স্বাধীনতা কেড়ে নেয়ে হয়েছে। মা-বোনের ইজ্জত-আব্রুর কোনো নিরাপত্তা নেই। প্রতিদিন ঘটছে ধর্ষণের ঘটনা।
নতজানু পররাষ্টনীতির কারণে বাংলাদেশ প্রতিদিনই কোন না কোনভাবে আগ্রাসী শক্তির দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে। আমাদের ভূ-প্রাকৃতিক পরিবেশ, মাটি, মানুষ ও সংস্কৃতির ওপর চলছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নিরবচ্ছিন্ন আগ্রাসন। বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে আগ্রাসী ভারতের সাথে একের পর এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হচ্ছে।তিস্তার পানি আমাদের দেয়া হচ্ছেনা। ফারাক্কা সমস্যার সমাধান করছেনা। গায়ের জোরে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মান করছে ভারত। সীমান্তে প্রতিদিন গুলি করে মানুষ হত্যা করছে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী - বিএসএফ। এসব সমস্যার সমাধানতো দুরে থাক জোরালো প্রতিবাদ পর্যন্ত নেই। অথচ বাংলাদেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে বাংলাদেশের আঞ্চলিক নদী ফেনি নদী থেকে পানি তুলে নেয়ার চুক্তি করলো সরকার। আর এই পানি চুক্তির কারণে ফেনির মুহুরি প্রজেক্ট পানির অভাবে পরিত্যক্ত ঘোষিত হবে।অগনিত কৃষককে না খেয়ে মরতে হবে। বেকার হবে শত শত জেলে। জীববৈচিত্র্য ধবংস হয়ে যাবে।
তাই আধিপত্যবাদী শক্তি এবং তাদের এদেশীয় প্রতিভূদের রুখতে মওলানা ভাসানী প্রদর্শিত পথই আমাদের পাথেয়।


0 Comments